মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:৫২ পূর্বাহ্ন
কোটি মানুষের জানাযায় রাখাল রাজার পাশে রাখাল রানী সমাহিত Reading Time: 4 minutes
ডেইলি সারাবংলা ডেক্স :
বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এক বুক ভালোবাসায় অশ্রুসিক্ত নয়নে প্রিয় নেত্রীকে বিদায় জানিয়েছেন লাখো লাখো মানুষ।

বুধবার (৩১ ডিসেম্বর-২০২৫) বিকাল ৩টার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও প্লাজা-সংলগ্ন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউসহ ঢাকা শহর জুড়ে খালেদা জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইমামতি করেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মোহাম্মদ আবদুল মালেক।
জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ, বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের প্রতিনিধি, বিদেশি অতিথি, আলেম-ওলামাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লাখ লাখ মানুষ অংশ নেন।

কোটি মানুষের জানাজায় রাখাল রাজার পাশে রাখাল রানী সমাহিত
জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরের মাঠ, বাইরের অংশ, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ছাড়িয়ে বিজয় সরণি, কারওয়ান বাজার, আগারগাঁও ও শ্যামলি পর্যন্ত এলাকা জানাজার লাইন ছাড়িয়ে যায়।
জানাজায় খালেদা জিয়ার বড় ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তার পরিবার ও স্বজন, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্যমণ্ডলীসহ বিএনপির শীর্ষ ও তৃণমূলের বিপুল সংখ্যক নেতা-কর্মী ও সমর্থক উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রতিনিধি, বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধি, এনসিপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং নানা শ্রেণিপেশার সর্বস্তরের মানুষ জানাজায় অংশ গ্রহন করেন।কান্নাজড়ি কণ্ঠে এ সময় তারেক রহমান বলেন, আমি মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার বড় সন্তান হিসেবে বলছি, এখানে যারা উপস্থিত আছেন, আমার মা জীবীত থাকা অবস্থায় আপনাদের কারো কাছ থেকে যদি কোনো ঋণ নিয়ে থাকেন, দয়া করে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। আমি সেটি পরিশোধের ব্যবস্থা করব।
তিনি বলেন, একইসঙ্গে উনার কোনো ব্যবহারে, কথায় যদি কেউ আঘাত পেয়ে থাকেন, তাহলে মরহুমার পক্ষ থেকে আমি আপনাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। দোয়া করবেন, আল্লাহ তাআলা যেন উনাকে বেহেশত দান করেন।

খালেদা জিয়ার জানাজা উপলক্ষে আজ (বুধবার) সকাল থেকেই সংসদ ভবন ও এর আশপাশের এলাকা জনসমূদ্রে পরিণত হয়। রাজধানী ঢাকা, এর আশপাশের জেলা ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দলে দলে মানুষ ঢাকায় এসে জড়ো হন। এ সময় অনেককেই কালো ব্যাজ ধারণ করতে দেখা যায়। অনেকে প্রিয় নেত্রীর শোকবার্তা-সংবলিত ব্যানার, প্ল্যাকার্ড নিয়ে হাজির হন।
খালেদা জিয়ার জানাজা ও দাফনকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদ ভবনসহ রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে, নেওয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। পুলিশ, বিজিবি, র্যাব মোতায়েন করা হয়েছে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এবং আশেপাশে এলাকাজুড়ে। সেনাবাহিনীর সদস্যদের টহল দিতে দেখা গেছে।
কার্যক্রম ঘিরে ১০ হাজারেরও বেশি পুলিশ, এপিবিএনসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছে। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে বিজিবির ২৭ প্লাটুন সদস্যও মোতায়েন করা হয়েছে।

এর আগে, সকাল ৯টার একটু আগে বাংলাদেশের পতাকায় মোড়ানো একটি গাড়িতে করে তার মরদেহ এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে গুলশানের বাসায় নেওয়া হয়। সেখানে তাকে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানান খালেদা জিয়ার স্বজন ও বিএনপির নেতা-কর্মীরা।
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া চলে গেলেন। ফিরে গেলেন সৃষ্টিকর্তার কাছে, ঠিক যেমনটি সুরা আল বাকারায় বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁর কাছেই ফিরে যাব।’
খালেদা জিয়া হাসপাতালে সিসিইউ এবং আইসিইউতে কাটাচ্ছিলেন কয়েক সপ্তাহ ধরে। তিনি যেন তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমানের প্রতীক্ষাতেই ছিলেন। এরপর তারেক রহমান এলেন, বেগম জিয়া চলে গেলেন।
বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে বেগম খালেদাই একমাত্র সরকার প্রধান, যিনি নিজের সম্মান অক্ষুণ্ন রেখে ক্ষমতা ছেড়েছেন এবং স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি ছিলেন একজন সম্মানিত নারী, যিনি নিজের সম্মানকে ক্ষমতার চেয়েও বেশি মর্যাদা দিতেন।

বেগম জিয়া ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় যতটুকু সম্মানিত ছিলেন, ক্ষমতার বাইরে অবস্থান করে তিনি তার চেয়ে কম সম্মানিত ছিলেন না। মৃদু হাসির আড়ালে তিনি ছিলেন একজন কঠোর রাজনীতিবিদ। কঠোর না হলে তিনি এত বড় একটি রাজনৈতিক দলে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারতেন না। তবে তাঁর কঠোরতার মধ্যে কোনো হিংস্রতা ও রুক্ষতা ছিল না।
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দাফন সম্পন্ন
তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। রাজধানীর জিয়া উদ্যানে স্বামী সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধির পাশেই চিরশায়িত করা হয়েছে ‘আপসহীন’ এই নেত্রীকে।বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) বিকেল সাড়ে চারটায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ‘গণতন্ত্রের মা’ খ্যাত খালেদা জিয়ার দাফন সম্পন্ন হয়। এ সময় ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও পরিবারের সদস্য, সেনা প্রধান ওয়াকারুজ্জামানসহ ৩ বাহিনীর প্রধানগন সহ দেশের গুরুত্বপুর্ন ব্যাক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। এসময় দেশবরেণ্য আলেম শায়েখ আহমাদুল্লা, মিজানুর রহমান আজহারী ও মাওলানা মামুনুল হক উপস্থিতি ছিলেন। দাফনের পর খালেদা জিয়াকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানো হয়। দেওয়া হয় সশস্ত্র বাহিনীসহ ৩ বাহিনীর গার্ড অব অনার।সেখানে খালেদা জিয়ার পুত্র বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার মায়ের জন্য সবার কাছে দোয়া কামনা করেন।

দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় খালেদা জিয়া মারা যান।